সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়াগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।(Processes of Soil Formation)

 মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া গুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা



       আবহবিকার এর প্রভাবে ভূত্বকের উপরে চূর্ণ-বিচূর্ণ,  বিয়োজিত শিলার যে আলগা স্তর দেখা যায় তাকে রেগোলিথ বলে। জল, উষ্ণতা, শিলাগঠনকারী খনিজ, জৈব পদার্থ এবং জীবজগতের পারস্পরিক ক্রিয়া বিক্রিয়ায় কালক্রমে রেগোলিথ থেকে মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়।
       মৃত্তিকার উৎপত্তি সংক্রান্ত এই প্রক্রিয়া পেডোজেনেসিস নামে পরিচিত। মৃত্তিকা সৃষ্টির তিনটি প্রক্রিয়া আছে। যথা-

     ক) প্রাথমিক প্রক্রিয়া
     খ) মৌলিক প্রক্রিয়া
     গ) বিশেষ প্রক্রিয়া

ক) প্রাথমিক প্রক্রিয়া

        মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রাথমিক প্রক্রিয়া গুলি হল আবহবিকার এবং পরিলেখ গঠন।

খ) মৌলিক প্রক্রিয়া

      যে সকল প্রক্রিয়া মৃত্তিকা সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে তাদের মৌলিক প্রক্রিয়া বলে। এই প্রক্রিয়া গুলি হল হিউমিফিকেশন, খনিজকরণ, এলুভিয়েশন, ইলুভিয়েশন
      এই সকল প্রক্রিয়া গুলি কার্যকরী হয় সংযোজন, অপসারণ, রূপান্তর এবং স্থানান্তরের মাধ্যমে। নিম্নে এই প্রক্রিয়া গুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল।

   A) সংযোজন

            রেগোলিথ বা মৃত্তিকার মধ্যে যা যুক্ত হয় তা সংযোজন। যেমন- বৃষ্টিপাত ও তুষারপাতের ফলে রেগোলিথ এর মধ্যে জল যুক্ত হয়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ জৈব পদার্থ রূপে মাটিতে যুক্ত হয়। রাসায়নিক আবহবিকার এর ফলে শিলা বিয়োজিত হয়ে মাটিতে বিভিন্ন খনিজ দ্রব্যের সংযোজন ঘটায়।

B) অপসারণ

        মৃত্তিকা থেকে যা নির্গত হয় তা অপসারণ নামে পরিচিত। যেমন-বাষ্পীভবনের ফলে জল এবং ভূমিক্ষয়ের ফলে মাটি অপসারিত হয়। মাটির মধ্যে থাকা জৈব পদার্থ জারিত হয়ে জল ও কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয় এবং বায়ুতে মিশে যায়।

C) রূপান্তর

          মাটিতে থাকা বিভিন্ন পদার্থ এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়। মৃত্তিকার মধ্যে থাকা খনিজ পদার্থ গুলি ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে গৌণ খনিজে রূপান্তরিত হয়। জৈব পদার্থ হিউমিফিকেশন এবং খনিজকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়।

       i) হিউমিফিকেশন

                উদ্ভিদের দেহাবশেষ যেমন- মূল, পাতা, কান্ড, ফুল, ফল প্রভৃতি ও প্রাণীর দেহাবশেষ মৃত্তিকায় কাঁচা জৈব পদার্থ হিসেবে যুক্ত হয়। এইসকল জৈব পদার্থ সূক্ষ্ম জীবাণু বা অণুজীব দ্বারা পাচিত হয় এবং ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে এক অবিযোজিত কালো পদার্থের সৃষ্টি করে একে হিউমাস বলে। হিউমাস গঠনের এই প্রক্রিয়া হিউমিফিকেশন নামে পরিচিত। হিউমিফিকেশন চার প্রকার। যথা-

      অ) অবায়ুজীবী হিউমিফিকেশন
               জলাশয়, হ্রদ, পুকুর প্রভৃতি জলাশয়ের নিচে বায়ু বা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে জৈব পদার্থের বিশেষ ধরনের পচন ঘটে একে হিউমিফিকেশন বলে। এক্ষেত্রে মিথেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন প্রকৃতি গ্যাসের সৃষ্টি হয়।

      আ) আম্লিক হিউমিফিকেশন
                 যে সকল স্থানে চুনজাতীয় পদার্থ বা অন্য পরিপোষক এর অতি অভাব সেখানে যে হিউমিফিকেশন চলতে থাকে তাকে আম্লিক   হিউমিফিকেশন বলে। গুুল্ম জাতীয়উদ্ভিদ আচ্ছাদিত অঞ্চলে, পাইন জাতীয় উদ্ভিদ আচ্ছাদিত অঞ্চলে, শীতপ্রধান অঞ্চলে যেখানে জৈব পদার্থের পচন ব্যাকটেরিয়াা দ্বারা হয়না এবং জৈব পদার্থ সম্পূর্ণ জারিত হয় না সেখানে অম্লধর্মী জৈব পদার্থের সৃষ্টি হয়।
              এছাড়া সারাবছর ধৌত প্রক্রিয়া চলতে থাকায় মৃত্তিকার উপরে অবস্থিত বিভিন্ন রকম খনিজ পদার্থ যেমন- ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম প্রভৃতি মৃত্তিকার নিচের স্তরে সঞ্চিত হয় এবং উপরের মৃত্তিকা অম্লধর্মী হয়ে পড়ে।



        ই) মরুপ্রায় অঞ্চলের হিউমিফিকেশন
                  স্তেপ, প্রেইরি তৃণভূমি অঞ্চলে এই প্রকার হিউমিফিকেশন দেখা যায়। মৃত্তিকায় অধিক পরিমাণে জৈব পদার্থ সঞ্চিত হওয়ায় মৃত্তিকার রং হয় কালো।


        ঈ) উষ্ণ ও আদ্র ক্রান্তীয় অঞ্চলের হিউমিফিকেশন
                  নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলে এই প্রক্রিয়ায় হিউমাস সৃষ্টি হয়। উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাত অধিক হওয়ায় জৈব পদার্থের অধিকাংশ খনিজকৃত হয়। ফলে জৈব পদার্থ কম থাকে।


        ii) খনিজকরণ

                   হিউমাস গঠনকারী খনিজ সমূহ যেমন-ফসফরাস, লোহা প্রভৃতি যে প্রক্রিয়ায় পুনরায় মৃত্তিকায় ফিরে আসে তাকে খণিজকরণ প্রক্রিয়া বলে। এটি হিউমিফিকেশন এর বিপরীত প্রক্রিয়া অর্থাৎ খনিজ পদার্থের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া।


D) স্থানান্তর

    জলের সঙ্গে দ্রবীভূত ও ধৌত  প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পদার্থ মৃত্তিকা পরিলেখে স্থানান্তরিত হয়। দুটি প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর ঘটে।

   

i)এলুভিয়েশন (Eluviation)

        মৃত্তিকার উপরিস্তর থেকে অথবা মৃত্তিকা পরিলেখ এর A স্তর বা হরাইজন থেকে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ যেমন- লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, ক্যালসিয়াম প্রভৃতি বৃষ্টির জলের সঙ্গে ধৌত  প্রক্রিয়ায় বা দ্রবীভূত হয়ে নিচের দিকে স্থানান্তরিত হয়। একে এলুভিয়েশন প্রক্রিয়া বলে। এর ফলে মৃত্তিকার উপরিস্তরে খনিজ পদার্থের অভাবে ঘটে।

         এলুভিয়েশন প্রক্রিয়ায় মৃত্তিকার উপরিস্তর বা A স্তর খনিজ পদার্থ বিহীন হয়ে পড়ায় এই স্তরটিকে অ্যালুভিয়াল স্তর বা এলুভেটেড স্তর বলে।


এলুভিয়েশনের বৈশিষ্ট্য

i) এই প্রক্রিয়া মৃত্তিকার উপরিস্তরে ঘটে।
ii) এই প্রক্রিয়ার ফলে A স্তরের সৃষ্টি হয়।
iii) খনিজ পদার্থ গুলি উপরিস্তর থেকে নিচের স্তরে স্থানান্তরিত হয় ফলে উপরের স্তর খনিজপদার্থ বিহীন হয়ে পড়ে।
iv) এটি একটি মৌলিক প্রক্রিয়া।
v) মৃত্তিকার উপরিস্তর হালকা বর্ণ ধারণ করে।


ii)ইলুভিয়েশন (Illuviation)

              মৃত্তিকার উপরে স্তর বা A স্তর থেকে মৃত্তিকা কনা বা খনিজ পদার্থগুলি ধৌত বা দ্রবীভূত হয়ে মৃত্তিকার নিচের স্তর বা B স্তরে স্থানান্তরিত হয়ে সঞ্চিত হয়। নিচের স্তর বা B স্তরে এই সঞ্চয় পদ্ধতিকে বলে ইলুভিয়েশন। যে স্তরে এই পদার্থসমূহের সঞ্চয় হয় সেই স্তরকে ইলুভিয়াল স্তর বা ইলুভিয়েটেড হরাইজন বলে।

            বেশি বৃষ্টিপাত যুক্ত  অঞ্চলে ইলুভিয়েশন হয় প্রায় 150 সেন্টিমিটার গভীরতায়  এবং কম বৃষ্টিপাত যুক্ত  অঞ্চলে ইলুভিয়েশন হয় 50 সেন্টিমিটার গভীরতায়।


ইলুভিয়েশন প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য

i) এটি একটি সঞ্চয়জাত প্রক্রিয়া যা মৃত্তিকার কিছুটা গভীরে সম্পন্ন হয়।
ii) কম বৃষ্টিপাত যুক্ত  অঞ্চলে এই স্তরের গভীরতা কম হয় এবং বেশি বৃষ্টিপাত যুক্ত  অঞ্চলে এই স্তরের গভীরতা বেশি হয়।
iii) উপরের স্তর থেকে আগত খনিজ পদার্থ এই স্তরে সঞ্চিত হয়।
iv) খনিজ পদার্থে পূর্ণ হওয়ায় এই স্তরের রং গাঢ় হয়।
v) এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্তিকার B স্তরের সৃষ্টি হয়।


গ) বিশেষ প্রক্রিয়া

        পৃথক পৃথক মৃত্তিকা সৃষ্টির জন্য পৃথক পৃথক প্রক্রিয়া দায়ী। এই প্রক্রিয়া গুলি বিশেষ প্রক্রিয়া নামে পরিচিত।প্রক্রিয়া গুলি সব ধরনের পরিবেশে সক্রিয় হয় না।
     এখানে কয়েকটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় দেওয়া হল-

A) ল্যাটেরাইজেশন
        উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে (ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চল) A স্তর থেকে বিভিন্ন ক্ষারকীয় পদার্থসমূহ দ্রবীভূত এবং ধৌত প্রক্রিয়ায় নিচের দিকে চলে যায়। B স্তরে লোহা অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি সঞ্চিত হয় এছাড়া অন্যান্য খনিজ পদার্থ এই স্তরে সঞ্চিত হয়। ফলে B স্তরে কঠিন ও অদ্রবণীয় পদার্থের স্তর গঠন করে। একে ডুরিক্রাস্ট বলে।


B) পডসলাইজেশন
           এটি শীতল আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলে পডসল মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া। এই অঞ্চলে A স্তর থেকে ক্ষারকীয় পদার্থ ধৌত প্রক্রিয়া প্রক্রিয়ায় অপসারিিত হয় ও মৃত্তিকার উপরে সিলিকার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। মৃত্তিকার   স্তরে অদ্রবণীয় পদার্থের একটি স্তর গড়ে ওঠে একে হার্ডপ্যান বলে।

C) ক্যালসিফিকেশন
           প্রেইরি, স্তেপ প্রভৃতি নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি অঞ্চলে মৃত্তিকা পরিলেখে কোন স্তরে চুন জাতীয় পদার্থ (Ca, CaCo3 ) সঞ্চিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ক্যালসিফিকেশন বলে। ক্যালসিয়াম সঞ্চয় এর ফলে শক্ত স্তর গড়ে ওঠে একে ক্যালিচে বলে। চারনোজেম, চেস্টনাট প্রভৃতিি মৃত্তিকা এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়।


D) গ্লেইজেশন 
        যেসকল নিম্নভূমি বা জলাভূমিতে সর্বদা জল জমে থাকে সেখানে মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া গ্লেইজেশন নামে পরিচিত। জল জমে থাকায় মাটিতে অক্সিজেনের যোগান থাকেনা। ফলে এখানে বিজারণ প্রক্রিয়া অধিক কার্যকর হয়। এই প্রকার মাটির রং নীলাভ বাদামি বা ধূসর হয়। এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট মাটিকে হাইড্রোমর্ফিক মাটি বলে।

E) স্যালিনাইজেশন
          এটি মরু বা মরু প্রায় অঞ্চলের লবণাক্ত (সোলোনচাক) মাটি সৃষ্টির প্রক্রিয়া। মাটিতে Ca, Mg, Na লবণ সালফেট বা ক্লোরাইড রূপে সঞ্চিত হয়। মরু বা মরুপ্রায় অঞ্চল, সমুদ্রতীর এবং শুষ্ক অঞ্চলে এই প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়।

F) অ্যালকালাইজেশন
            যে প্রক্রিয়ায় মাটিতে কর্দম বা কাদাকনা যৌগের সঙ্গে সোডিয়াম আয়ন বেশি পরিমাণ জমাটবদ্ধ হয়ে মাটি ক্ষারধর্মী হয়ে পড়ে তাকে অ্যালকালাইজেশন বা ক্ষারীয়করণ বলে। এই প্রক্রিয়া শুষ্ক মরু অঞ্চলে বেশি সক্রিয় হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Monsoon Though (মৌসুমী ট্রাফ)//Break of Monsoon বা বৃষ্টিপাতের ছেদ//Onset Vortex//N.L.M.(Normal Limit of Monsoon)

 Monsoon Though (মৌসুমী ট্রাফ) কি?       বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নিম্নচাপ অবস্থান করলে তাকে Though বলে। মৌসুমী বায়ু ভারতে আগমনের পূর্বে 5 ডিগ...