শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মহীসঞ্চরণ মতবাদ ( Continental Drift Theory)

 মহীসঞ্চরণ মতবাদ ( Continental Drift Theory)।মহাদেশীয় প্রবাহ। মহাদেশ সঞ্চালন বলতে কি বুঝ?মহীসঞ্চরণ তত্ত্বের প্রবক্তা কে?মহাদেশীয় সঞ্চালন কাকে বলে? মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব



মহীসঞ্চরণ মতবাদ ( Continental Drift Theory)

         বর্তমানে মহাদেশগুলো স্থির বলে মনে হয়। আলফ্রেড ওয়েগনার যিনি একজন আবহবিদ ছিলেন তার মতে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশ গুলি বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলকে অতিক্রম করে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। 1912 সালে তিনি তাঁর মতবাদটি প্রথম প্রকাশ করেন। পরে 1922 সালে জার্মান ভাষায় লেখা তার বই "Die Entstehung der Kontinente und Ozean"  এর ইংরেজি অনুবাদ 1924 সালে প্রকাশিত হয়। এরপর মহীসঞ্চরণ মতবাদ বিজ্ঞানী মহলে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে।


মতবাদের মূল কথা

       ওয়েগনারের মতে পার্মিয়ান যুগে মহাদেশীয় ভূখণ্ড গুলি মিলিতভাবে দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্য অক্ষাংশে অবস্থান করতো। ওয়েগনার একে ' বলেছে যার অর্থ সমস্ত ভূখণ্ড। যার কেন্দ্রে ছিল আফ্রিকা মহাদেশ। দক্ষিণ মেরু অবস্থান করতো 45° পূর্ব দ্রাঘিমা রেখা এবং 50° দক্ষিণ অক্ষরেখার সংযোগস্থলে। 

প্যানজিয়ার উত্তরে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়া দ্বারা গঠিত অংশ লরেশিয়া বা আঙ্গারাল্যান্ড নামে পরিচিত। প্যানজিয়ার দক্ষিনে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, উপদ্বীপীয় ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং আন্টার্কটিকা দ্বারা গঠিত অংশ গনডোয়ানাল্যান্ড' নামে পরিচিত।
     আঙ্গারাল্যান্ড এবং গনডোয়ানাল্যান্ড' এর মধ্যবর্তী অগভীর সমুদ্র টেথিস নামে পরিচিত। প্যানজিয়ার চারপাশে যে বিশাল জলভাগ অবস্থিত তাকে প্যানথালাসা বলে।
      ওয়েগনারের মতে মেসোজোয়িক যুগের শুরুতে প্যানজিয়া বিভিন্ন খন্ডে বিভক্ত হয়ে সঞ্চারিত হতে থাকে। উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা পশ্চিম দিকে সঞ্চারিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগর গঠন করে। অস্ট্রেলিয়া পূর্বদিকে সঞ্চারিত হয়ে ভারত মহাসাগর গঠন করে। এই সময় আন্টার্টিকা দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে থেকে যায়। মহাদেশ গুলির সঞ্চারণ এর পর অবশিষ্ট প্যানথালাসা প্রশান্ত মহাসাগর রূপে থেকে যায়।
        ওয়েগনারের মতে উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা পশ্চিম দিকে সঞ্চারিত হয়। সঞ্চারণ এর সময় সিমায় (SiMa) বাধা পেয়ে যথাক্রমে রকি পর্বত এবং আন্দিজ পর্বত এর সৃষ্টি হয়।

মহীসঞ্চরণের কারণ


i) বৈষম্যমূলক অভিকর্ষজ বল

             পৃথিবীর অভিগত গোলক হওয়ায় মহাদেশের উপর প্রযুক্ত অভিকর্ষজ বল এবং প্লবতা বল একই সরলরেখায় কার্যকর হয় না বরং প্লবতা বল নিরক্ষরেখার দিকে বেঁকে থাকে ফলে মহাদেশগুলির উপর এক অতিরিক্ত বল ক্রিয়া করে। বৈষম্যমূলক অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে মহাদেশগুলি নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে সঞ্চারিত হয়।

ii) জোয়ারি বল

                সূর্য ও চন্দ্রের আকর্ষণে নদীতে বা সমুদ্রে জোয়ার হয়। ওয়েগনারের মতে এই জোয়ারের ফলে এবং পৃথিবী ক্রমাগত পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করার ফলে মহাদেশগুলি পশ্চিম দিকে সঞ্চারিত হয়।

iii) মহীসঞ্চরণের তৃতীয় শক্তি

               শেওয়েডার এর মতে পৃথিবীর মহাদেশের আবর্তন অক্ষ সমগ্র পৃথিবীর আবর্তন অক্ষ থেকে আলাদা। ফলে মহাদেশগুলি শুধু পশ্চিম দিকে নয় নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে সঞ্চারিত হয়। এই তত্ত্বকে অয়লারের তত্ত্ব ও বলা হয়।


মহীসঞ্চরণের প্রমাণ


i)জিগ-স-ফিট(jig saw fit)

           কঠিন বস্তু ভেঙে যাওয়ার পর যেমন জোড়া লাগানো যায় তেমনি আটলান্টিক মহাসাগর এর বিপরীত উপকূল রেখার মধ্যে ওয়েগনার সেই রকম জোর লক্ষ করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ব্রাজিলের রক অন্তরীপ গিনি উপসাগরে এবং পশ্চিম আফ্রিকার স্ফীত অংশ মেক্সিকো উপসাগরে জোড়া লাগানো যায়। ওয়েগনারের মতে মহীসঞ্চরণ এর ফলে মহাদেশগুলি বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

ii) ভূ-তত্ত্ব সংক্রান্ত প্রমাণ

             আটলান্টিক মহাসাগরের দুপাশে ভূ-গাঠনিক অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এর প্রমাণ হিসেবে ওয়েগনার আপালেশিয়ান পর্বতের কথা উল্লেখ করেন।আপালেশিয়ান পর্বতে হার্সেনিয়ান যুগের ভাঁজ ক্যালিডোনিয়ান যুগের ভাঁজের সঙ্গে ছেদ করে। ছেদ করার পর ক্যালিডোনিয়ান যুগের ভাঁজ হার্শিনি অন যুগের ভাঁজের উত্তর এ অবস্থান করে। আটলান্টিক মহাসাগরের বিপরীত পারে অর্থাৎ ইউরোপে এই দুটি ভাঁজ এর অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এখানে ক্যালিডোনিয়ান যুগের ভাঁজ সর্বদা হার্সেনিয়ান যুগের ভাঁজের উত্তরে অবস্থান করে। পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে ক্যালিডোনিয়ান যুগের ভাঁজ রয়েছে।
         ভূতত্ত্ব সংক্রান্ত এই মিল ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং গ্রীনল্যান্ডের একত্র অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দেয়।
        পরবর্তীকালে Du Toit দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূল এবং আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের মধ্যে ভূতত্ত্ব সংক্রান্ত মিল খুঁজে পান।

iii) প্রাচীন জলবায়ু সংক্রান্ত প্রমাণ

               ওয়েগনারের মতে বিভিন্ন মহাদেশগুলি  বিভিন্ন তাত্ত্বিক যুগে বিভিন্ন জলবায়ুর সম্মুখীন হয়েছে এবং তার নিদর্শন পাওয়া গেছে। উত্তর আমেরিকায় পার্মিয়ান কার্বনিফেরাস যুগের কয়লা স্তর লক্ষ্য করা যায়। এই কয়লার স্তর নিরক্ষীয় জলবায়ুর সাক্ষ্য বহন করে। একই অঞ্চলে পাললিক শিলাস্তর এর সঙ্গে লবণের স্তর দেখা যায় যা শুষ্ক জলবায়ু নির্দেশ করে। এর থেকে বলা যায় উত্তর আমেরিকা প্রথমে নিরক্ষীয় অঞ্চলে, পরবর্তীতে ক্রান্তীয় অঞ্চলে পরবর্তীতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে সঞ্চারিত হয়েছে।

iv) জীবাশ্ম সংক্রান্ত প্রমাণ

            পার্মিয়ান কার্বনিফেরাস যুগে সঞ্চিত গণ্ডশিলা সমন্বিত শিলাস্তরের মধ্যে গ্লসপটেরিস নামক এক প্রকার ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ এর জীবাশ্ম পাওয়া যায়। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, আন্টার্টিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় এই প্রকার জীবাশ্মের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।
              একইভাবে ক্যাঙ্গারু জাতীয় প্রাণী প্রচুর পরিমাণে দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে এবং অস্ট্রেলিয়ায় জীবন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যান্য মহাদেশে এদের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এই ঘটনা দক্ষিণ গোলার্ধের মহাদেশগুলির একত্র সমাবেশের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

v) হিমবাহের অবস্থান

           দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, আন্টার্টিকা প্রভৃতি স্থানে হিমবাহের প্রাচীন অধঃক্ষেপের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ভূ বিজ্ঞানীরা মনে করেন পার্মিয়ান যুগ থেকে কার্বনিফেরাস উপযুগে এই অংশগুলি শীতল জলবায়ুর অন্তর্গত ছিল। বর্তমানে ভূখন্ডগুলি ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থান করে।


vi) মেরু সরণ

            ওয়েগনারের মতে মহাদেশের সঞ্চরণ এর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু স্থান পরিবর্তন করে। পুরা চুম্বকের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন যুগের মেরু নির্ণয় করা যায়। মেরুর অবস্থানগুলি যোগ করে মেরু ভ্রমণ রেখা পাওয়া যায়। এর থেকে মহাদেশ গুলির সঞ্চরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

সমালোচনা

i) ওয়েগনার মহাদেশ গুলির সঞ্চরণ এর কারণ হিসেবে যে জোয়ারি বল এবং বৈষম্যমূলক অভিকর্ষজ বলের কথা বলেছে তা এতই নগন্য যে এই বলের পক্ষে মহাদেশ গুলির ভাঙ্গন এবং সঞ্চরণ সম্ভব নয়।

ii) ওয়েগনারের মতে কার্বনিফেরাস যুগে মহাদেশগুলির ভাঙ্গন হয় এবং সঞ্চরণ হয়। এর আগে কেন ভাঙ্গন এবং সঞ্চরণ সম্ভব হলো না ওয়েগনার সে বিষয়ে কিছু বলেননি।

iii) আটলান্টিক মহাসাগরের উভয় পাশের উপকূল কে পুরোপুরি জোড়া লাগানো সম্ভব নয়।

iv) ওয়েগনার জীবাশ্ম সংক্রান্ত যে সকল বিষয়ে আলোচনা করেছেন পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হওয়া অন্যান্য জীবাশ্মের ব্যাখ্যা দিতে গেলে মতবাদটিকে পুনরায় সাজাতে হবে।

v) সকল ভূবিজ্ঞানী মেরু সরণ অসম্ভব বলে মনে করেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Monsoon Though (মৌসুমী ট্রাফ)//Break of Monsoon বা বৃষ্টিপাতের ছেদ//Onset Vortex//N.L.M.(Normal Limit of Monsoon)

 Monsoon Though (মৌসুমী ট্রাফ) কি?       বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নিম্নচাপ অবস্থান করলে তাকে Though বলে। মৌসুমী বায়ু ভারতে আগমনের পূর্বে 5 ডিগ...