শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২০

মৃত্তিকা সৃষ্টির নিয়ন্ত্রক সমূহ (Factors of Soil Formation)

 

 

          মৃত্তিকা সৃষ্টির নিয়ন্ত্রক সমূহ

                   


ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র একই ধরনের মৃত্তিকা সৃষ্টি হয় না ।কোথায় কি ধরনের মৃত্তিকা সৃষ্টি হয় তা নির্ভর করে মৃত্তিকা সৃষ্টির কারণ নিয়ন্ত্রক এর ওপর।

 রাশিয়ার মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ভি. ভি. ডকুচেভ(1883) স্তেপ তৃণভূমি অঞ্চলে গবেষণা করার সময় মৃত্তিকা সৃষ্টির চারটি কারণের কথা লক্ষ করেন। 


           তিনি এই কারন বা নিয়ন্ত্রকগুলি একটি সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করেন।

           S= f(cl, o, p, t )


এখানে

  S= মৃত্তিকা ( Soil)

   f= কারন বা নিয়ন্ত্রক (factors)

   cl=জলবায়ু ( climate)

   o=জীবজগৎ (Organism)

   p=আদি শিলা বা জনক শিলা (Parent rock)

   t=সময় (Time)



মার্কিন মৃত্তিকা বিজ্ঞানী এইচ. জেনি (H. Jenny,1958) মৃত্তিকা সৃষ্টির পাঁচটি কারণ এর কথা বলেন। তিনি ভি. ভি. ডকুচেভ এর চারটি নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে আরেকটি নিয়ন্ত্রক ভূপ্রকৃতির(Relief)  কথা বলেছেন।



এইচ. জেনির সমীকরণটি হলো-


            S= f(cl, o, r, p, t )


এখানে

  S= মৃত্তিকা ( Soil)

   f= কারন বা নিয়ন্ত্রক (factors)

   cl=জলবায়ু ( climate)

   o=জীবজগৎ (Organism)

   r=ভূপ্রকৃতি (Relief)

   p=আদি শিলা বা জনক শিলা (Parent rock)

   t=সময় (Time)





  মৃত্তিকা সৃষ্টির নিয়ন্ত্রক বা কারণগুলির শ্রেণীবিভাগ

            মৃত্তিকা সৃষ্টির কারন বা নিয়ন্ত্রকগুলিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়

       

           A) সক্রিয় কারণ( Active Factors):

           জলবায়ু ( climate), জীবজগৎ (Organism)


           B) নিষ্ক্রিয় কারণ( Passive Factors)

           ভূপ্রকৃতি (Relief), আদি শিলা বা জনক শিলা (Parent rock), সময় (Time)


           নিম্নে এই কারণগুলি বিস্তৃত আলোচনা করা হলো-


 A) সক্রিয় কারণ( Active Factors):


  ক)জলবায়ু ( climate)

          মৃত্তিকা সৃষ্টিতে জলবায়ুর ভূমিকা সর্বাধিক। জলবায়ুর প্রভাব আলোচনা করার সময় অন্যান্য কারণগুলিকে অপরিবর্তিত ধরা হয়। জলবায়ুর প্রধান দুটি উপাদান হলো বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা। এই উপাদানগুলি জনক শিলার উপর কার্যকরী হয়ে রেগোলিথ গঠন করে এবং রেগোলিথ এর উপর ক্রিয়া করে মৃত্তিকা পরিলেখ গঠন করে।


      a) বৃষ্টিপাতের প্রভাব

               মোট বৃষ্টিপাতের 15-50 ভাগ জল মাটির নিচে চুইয়ে  প্রবেশ করে। মৃত্তিকার নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর বৃষ্টিপাতের প্রভাব রয়েছে।


         i) মৃত্তিকার গভীরতার উপর প্রভাব

                বৃষ্টিপাত বেশি হলে মৃত্তিকার গভীরতা বেশি হয় এবং বৃষ্টিপাত কম হলে গভীরতা কম হয়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে এবং আদ্র নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে মৃত্তিকার অধিক পরিমান জল থাকায় মৃত্তিকা যথেষ্ট গভীর হয়। অপরদিকে মরু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় মৃত্তিকা হরাইজন গড়ে ওঠে না।


           ii) রাসায়নিক উপাদানের উপর প্রভাব

                    বৃষ্টিপাত বেশি হলে ধৌত প্রক্রিয়ায় ক্ষার জাতীয় পদার্থ K 2 O, Na 2O, CaO প্রভৃতি মৃত্তিকার গভীরে সঞ্চিত হয়। ফলে মৃত্তিকার উপরিভাগ অম্লধর্মী হয়।

            মরু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় ক্ষার জাতীয় পদার্থ মৃত্তিকার উপর সঞ্চিত হয়।



           iii) খনিজ লবণের উপর প্রভাব

                         অধিক বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে সহজ দ্রবণীয় পদার্থসমূহ,যেমন-ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম প্রভৃতি যৌগ অপসারিত হয়।                কম বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে এগুলি মৃত্তিকার উপরিভাগের সঞ্চিত হতে থাকে।




          b) তাপমাত্রা (Temperature)

                      ভ্যান্টহফ এর সূত্র অনুযায়ী প্রতি 10° তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। এই কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী স্থানে রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার অধিক হয়। নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে যতই মেরুর দিকে যাওয়া যায় রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার ততই কমতে থাকে।

           নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর উপর তাপমাত্রার প্রভাব পড়ে-


                i) মৃত্তিকার গভীরতার উপর প্রভাব

                          অধিক তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে শিলা দ্রুত আবহবিকারের দ্বারা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। ফলে মৃত্তিকা গভীর হয়। কম তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে মাটি কম গভীর হয়।


                ii) জৈব পদার্থ এবং নাইট্রোজেনের পরিমাণের ওপর প্রভাব

                            অধিক তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে হিউমিফিকেশন প্রক্রিয়ার গঠিত হিউমাস দ্রুত খনিজকরণ হয়। ফলে মাটিতে জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম হয়। কম তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে মাটিতে জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেশি থাকে।


                 iii) কর্দম খনিজের পরিমাণের ওপর প্রভাব

                                অধিক তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার বেশি হওয়ায় দ্রুত মূল খনিজ গৌণ খনিজে পরিণত হয় অর্থাৎ মৃত্তিকায় কর্দম খনিজের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।


   খ)জীবজগৎ (Organism)

              মৃত্তিকায় জৈব পদার্থের প্রভাব এতটাই বেশি যে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়। স্তেপ ও প্রেইরি তৃণভূমি অঞ্চলে মৃত্তিকার উপরের স্তর জৈব পদার্থ পূর্ণ হয়ে চারনোজেম মৃত্তিকা সৃষ্টি হয় যা মৃদু ক্ষারধর্মী মৃত্তিকা।

        অন্যদিকে পাইন জাতীয় বনভূমি অঞ্চলে অম্ল জাতীয় জৈব পদার্থ মৃত্তিকাকে আম্লিক করে।

        জৈব পদার্থ মৃত্তিকার ভৌতধর্ম কে প্রভাবিত করে। যেমন-


   i) জৈব পদার্থ মৃত্তিকা কণাগুলোকে সঙ্ঘবদ্ধ করে মৃত্তিকার গঠনকে দৃঢ় করে।

   ii) জৈব পদার্থের জলধারণ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় জৈবপদার্থ যুক্ত মৃত্তিকা অধিক জল ধরে রাখতে পারে।

    iii) হিউমিফিকেশন প্রক্রিয়ার জৈব পদার্থ হিউমাসে পরিণত হয়। যার রং কালো। এ কারণে হিউমাস যুক্ত মৃত্তিকা কালো বা গাঢ় হয়।

    iv) জৈব পদার্থ বা হিউমাস মৃত্তিকা কণাগুলোকে সঙ্ঘবদ্ধ করে ফলে মৃত্তিকা ক্ষয় কম হয়।

    v) হিউমাস বা জৈব পদার্থ মৃত্তিকা কণাগুলোকে সঙ্ঘবদ্ধ করে গুটি তৈরি করে।

    vi) মৃত্তিকায় জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকলে ক্যাটায়ন বিনিময় হার বৃদ্ধি পায়।


           

  B) নিষ্ক্রিয় কারণ( Passive Factors)


       ক)ভূপ্রকৃতি (Relief)

                  ভূপৃষ্ঠের উপরে ভূমি ভাগের প্রকৃতি সর্বদা সমান নয়। কোথাও খাড়াঢাল যুক্ত কোথাও মাঝারি ঢাল যুক্ত কোথাও সমতল ভূমি লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন ঢাল যুক্ত অঞ্চলে মৃত্তিকার গভীরতা ও গঠন ভিন্ন হয়। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


     i) সমতল ও প্রায় সমতল ভূমি

                   সমতল ও প্রায় সমতল ভূমিতে ভূমির ঢাল কম হওয়ার জন্য জল সহজে গড়িয়ে যেতে পারে না। জল অধিক সময় ভূপৃষ্ঠের উপরে জমাটবদ্ধ হওয়ার জন্য ভূ-অভ্যন্তরে সর্বাধিক গভীরে প্রবেশ করে। ফলে মৃত্তিকার গভীরতা বেশি হয়।


      ii) মাঝারি ঢালযুক্ত ভূমি

                      মাঝারি ঢালযুক্ত ভূমিতে খুব বেশি পরিমান জল মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মাটির গভীরতা মাঝারি প্রকৃতির হয়। প্রবাহমান জলের সঙ্গে সূক্ষ্ম কর্দম কনা ও জৈব পদার্থ দ্রবীভূত ও অপসারিত হওয়ায় মৃত্তিকা কর্কশ বালু ও কাঁকর যুক্ত হয়।


       iii) অধিক ঢালযুক্ত ভূমি

                        অধিক ঢাল যুক্ত ভূমিতে বৃষ্টির জল ভূপৃষ্ঠের উপর দিয়ে দ্রুত অপসারিত হয়। ফলে মৃত্তিকার গভীরতা খুব কম হয়। এমনকি কোন কোন স্থানে মৃত্তিকা সৃষ্টি সম্ভব হয় না।



           খ) সময় (Time)

                     একটি পরিণত মৃত্তিকা সৃষ্টি হতে কয়েক শতাব্দী বা কয়েক হাজার বছর সময় লেগে যায়। সময়ের তারতম্যের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন হারে মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়। যেমন-


               i) আবহবিকার এর হার

                       উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে আবহবিকার এর হার দ্রুত হওয়ায় মৃত্তিকা দ্রুত সৃষ্টি হয়। আবার মেরু অঞ্চলে বা মরু অঞ্চলে মৃত্তিকা সৃষ্টির হার খুব ধীর।


              ii) জনক শিলার প্রকৃতি

                         জনক শিলার কাঠিন্যের উপর মৃত্তিকা সৃষ্টির সময় নির্ভর করে। যেমন-শিলা কঠিন হলে ধীরগতিতে মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে কর্দম শিলা সহজে মৃত্তিকায় পরিণত হয়।


              iii) পলিসঞ্চয়

                            যে সকল অঞ্চলে প্রতি বছর পল্লী সঞ্চয় হয় সেখানে পরিণত মৃত্তিকা সৃষ্টি হতে অনেক সময় লাগে।


               iv) লোয়েস সঞ্চয়

                              যেখানে বায়ুর দ্বারা ধূলিকণা সঞ্চিত হয় সেখানে পরিণত মৃত্তিকা সৃষ্টি হয় না।


               v) পর্বত পাদদেশে প্রস্তর সঞ্চয়

                               পর্বত পাদদেশে প্রতিনিয়ত টালাস (talus)  স্ক্রী প্রভৃতি সঞ্চয় হয় বলে মৃত্তিকা কখনোই পরিণত হয় না।


              vi) ভূ-আলোড়ন

                            কোন স্থান উত্থিত হলে মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। কোন স্থান অবনমিত হলে মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রক্রিয়া দ্রুত হয় অর্থাৎ অল্প সময়ে মৃত্তিকা পরিণত লাভ করে। যে সকল স্থান সুবিস্তৃত সেখানে পরিণত মৃত্তিকা গড়ে ওঠে।


           গ)আদি শিলা বা জনক শিলা (Parent rock)

                           যে শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পরবর্তীতে মৃত্তিকা সৃষ্টি হয় তাকে জনক শিলা বা আদি শিলা বলে। আদি শিলার প্রকৃতির ওপর মৃত্তিকার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে। যেমন-


        i) মৃত্তিকার অম্লত্ব বা ক্ষারকত্ব 

               এটি মৃত্তিকার রাসায়নিক গুনাগুন। গ্রানাইট ও নিস এর মত আগ্নেয় শিলায় সিলিকার পরিমাণ বেশি থাকে বলে মৃত্তিকা অম্লধর্মী হয়। ব্যাসল্ট ও ডোলেরাইট ক্ষারধর্মী শিলা হওয়ায় এর থেকে সৃষ্ট মৃত্তিকা ক্ষারধর্মী হয়। পেরিডোটাইট, সার্পেন্টাইন থেকে অতি ক্ষারকীয় মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়।


         ii) মৃত্তিকার রং

                   মৃত্তিকার রং অনেক ক্ষেত্রে মূল শিলার উপর নির্ভর করে। লোহা বা ম্যাঙ্গানিজ সমৃদ্ধ মৃত্তিকা থেকে লাল রঙের বা ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার উৎপত্তি হয়। মৃত্তিকায় কোয়ার্ডস খনিজ এর পরিমান বেশি থাকলে মৃত্তিকার রং হয় সাদা বা ধূসর। চুনাপাথর থেকে উৎপন্ন মৃত্তিকা ধূসর হয় একে রেন্টজিনা বলে।


          iii) মাটি সৃষ্টির হার

                         জনক শিলা অম্লধর্মী হলে আম্লিক মৃত্তিকা যেমন পডসল মৃত্তিকা গঠন সহজ ও দ্রুত হয়। আদি শিলা ক্ষারধর্মী হলে আম্লিক মৃত্তিকা গঠন কঠিন ও বিলম্বিত হয়।


            iv) শিলা খনিজের সঙ্গে মাটির সম্পর্ক

                           শিলায় কোয়াটজ খনিজ অধিক থাকলে তার থেকে সৃষ্ট মৃত্তিকায় বালির ভাগ অধিক হয় এবং ফেল্ডসপার খনিজের আধিক্য থাকলে কর্দম কনার পরিমাণ অধিক হয়।


               v) মৃত্তিকার গঠন

                                মূল শিলায় চুনের পরিমাণ অধিক হলে মাটির দানাগুলি দৃঢ়ভাবে সংবদ্ধ হয় এবং গঠন কঠিন হয়। সোডিয়াম যৌগ বেশি থাকলে কণাগুলি বিচ্ছিন্ন হয় ও গঠন দুর্বল হয়।


1 টি মন্তব্য:

Monsoon Though (মৌসুমী ট্রাফ)//Break of Monsoon বা বৃষ্টিপাতের ছেদ//Onset Vortex//N.L.M.(Normal Limit of Monsoon)

 Monsoon Though (মৌসুমী ট্রাফ) কি?       বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নিম্নচাপ অবস্থান করলে তাকে Though বলে। মৌসুমী বায়ু ভারতে আগমনের পূর্বে 5 ডিগ...